বাংলা ভাষা মাতৃভাষা হলেও বানান নিয়ে প্রায়ই খটকায় পড়েন না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাঙালির কাজেকর্মে অবসরে নিদ্রায় কোথায় নেই বাংলা বানান নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধ? এমন জটিল সব সমস্যার নিরসনে মাহবুবুল হক প্রকাশ করেছেন তার নতুন বই খটকা বানান অভিধান।
খটকা বানান অভিধান pdf একটি বিষয় ভিত্তিক অভিধান বই, যেখানে বাংলা ভাষার সহজ-জটিল অভিধানগুলো আরো সহজ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই অভিধানে বানান নির্দেশনার লক্ষ্য কোনােভাবেই হুকুমদারি নয়। প্রমিত বানান ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে নির্দেশনা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা করা হয়েছে ভাষাবিশেষজ্ঞ, বানানবিশারদ, অভিধানকারদের অভিমত বিবেচনায় নিয়ে এবং বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসরণ করে।
খটকা বানান অভিধান হলো বাংলা খটকা বানানের নিয়ম সংবলিত একটি ভাষাভিত্তিক অভিধান। বইটি প্রথমা প্রকাশনী থেকে ২০১৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটির লেখক জনপ্রিয় প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মাহবুবুল হক। বাংলা ভাষার বানানকে আরো সহজিকরণে এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিজ্ঞজনেরা মতামত দিয়েছেন।
খটকা বানান অভিধান pdf বইয়ের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়:
প্রথমত, যেসব সংস্কৃতাগত শব্দের বানানে স্বরধ্বনির লিপিরূপে হ্রস্ব ও দীর্ঘ দুই রকম বানানই ব্যাকরণসম্মত, সেগুলাের বেলায় বাংলা ভাষার ধ্বনিপদ্ধতির সঙ্গে সংগতি রেখে হ্রস্ব কারের বানানটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
যেমন : কিংবদন্তি/কিংবদন্তী, পঞ্জি/পঞ্জী, শ্রেণি/শ্রেণী ইত্যাদির ক্ষেত্রে কিংবদন্তি, পঞ্জি, শ্রেণি ইত্যাদি বানানরূপকেই গ্রহণযােগ্য মনে করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কালক্রমে যেসব শব্দের বানানভেদ সৃষ্টি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে পুরােনাে বানান পরিহার করে সাম্প্রতিকতম বানানই ব্যবহার করা উচিত বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে গুণী, পক্ষী, প্রাণী, মন্ত্রী ইত্যাদি ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দ সমাসবদ্ধ হলে ঈ-কারের জায়গায় ইকার হয়ে যায়।
যেমন : গুণিজন, পক্ষিশাবক, প্রাণিবিদ্যা, মন্ত্রিপরিষদ। কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম এড়িয়ে এগুলােকে বাংলা সমাসবদ্ধ শব্দ হিসেবে বিবেচনা করলে এসব ক্ষেত্রে গুণীজন, প্রাণীবিদ্যা, মন্ত্রীপরিষদ বানানে লেখা চলে। তাতে বানানে সমতা আসে।
বাংলা একাডেমির বানানের নিয়মে বর্ণিত এই বিকল্প বিধানকে এই অভিধানে অনুসরণ করা হয়েছে। একই। বিবেচনা থেকে আপদ ও বিপদ শব্দকে পূর্বপদ হিসেবে নিয়ে আপৎকালীন, বিপৎকালীন না লিখে অভিধানের ভুক্তিশব্দ হিসেবে আপদকালীন ও বিপদকালীন ইত্যাদি বানান ব্যবহৃত হয়েছে।
চতুর্থত, সংস্কৃত ব্যাকরণের সন্ধির নিয়ম অনুসরণ করলে চক্ষুর্দান, চক্ষুলজ্জা, চক্ষুরােগ, চক্ষুঃশূল ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয়।
কিন্তু বাংলা ব্যাকরণের নিয়মে সমাসবদ্ধ রূপ হিসেবে চক্ষুদান, চক্ষুলজ্জা, চক্ষুরােগ, চক্ষুশূল ইত্যাদি বানানরূপই অধিকতর গ্রহণযােগ্য। এ অভিধানে দ্বিতীয় পন্থাকেই মান্য করা হয়েছে ।
সুনির্দিষ্টভাবে বানান অভিধান বলে এই অভিধানে শব্দের অর্থ, ব্যাকরণিক পরিচিতি, প্রয়ােগ-উদাহরণ ইত্যাদি দেওয়া হয়নি। তবে সমােচ্চারিত ও প্রায়-সমমাচ্চারিত শব্দের অর্থনির্দেশ করা হয়েছে।
এ অভিধানে নির্দেশিত বানান নিয়ে কারও কারও মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। সে ক্ষেত্রে এই অভিধানের নির্দেশনা পরিহার করার অধিকার তাঁদের আছে।
এ ধরনের একটি অভিধান প্রণয়নের ব্যাপারে প্রথম আমাকে জোরালাে সমর্থন দেন স্নেহভাজন বিপ্লব মজুমদার। আর এ অভিধানের পাণ্ডুলিপি তৈরির উৎসাহ দেন প্রথম আলাের সম্পাদক মতিউর রহমান। প্রথমার প্রধান সমন্বয়কারী জাফর আহমদ রাশেদের নিরন্তর তাগাদায় তৈরি হয় খসড়া পাণ্ডুলিপি।
তারপর রাশেদের উদ্যোগে এ অভিধানের খসড়া পাণ্ডুলিপি নিয়ে কবি-ছড়াকার আখতার হুসেন, গবেষকপ্রাবন্ধিক ড. মােরশেদ শফিউল হাসান ও শতাব্দী কাদেরের সঙ্গে প্রথমায় বৈঠক হয়। তাঁদের পরামর্শ ও মতামত পর্যালােচনা করে আমি পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করি। এঁদের সবাইকে জানাই কৃতজ্ঞতা।
পাণ্ডুলিপির প্রুফ সংশােধনে আমাকে সহায়তা করেছে স্নেহভাজন ড. ছানাউল্লাহ আল মুবীন, মেহেদী হাসান ও সৈয়দ আসাদুজ্জামান সজীব । শুভেচ্ছা রইল আমার এই গুণী ছাত্রদের জন্য। | এ অভিধানটি বাংলা ভাষাপ্রেমী সবার কাজে লাগলে এবং তাঁদের কাছ থেকে বইটিকে আরও ঋদ্ধ করার পরামর্শ পেলে আনন্দিত হব।
— মাহবুবুল হক চট্টগ্রাম, জানুয়ারি ২০১৭।
খটকা বানান অভিধান পরিচিতি
বর্ণানুক্রম : অ, অ্যা, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ, অনুস্বর, খন্ড্য–ত, ‘, ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, ট, ঠ, ড, ড, ঢ, ঢ, ণ, ৎ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, র, ল, শ, ষ, স, হ।
বানান সতর্কতা : শব্দের বিশেষ বানানের রীতি তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে দেখানাে হয়েছে। যেমন : অমসৃণ [ঋ-কারের পর ণ]। বানান-তুলনা : দুটি ভিন্ন শব্দের মধ্যে কমবেশি উচ্চারণ-সাদৃশ্য থাকলে তাদের বানান-বৈষম্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কিন্তু অব্যয় ব্যবহার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তশব্দ ও নির্দেশিত শব্দ মােটা হরফে দেখানাে হয়েছে। যেমন : অগ্রহায়ণ কিন্তু অঘ্রান। বর্জিত বানান : যেসব শব্দের বানান বর্তমানে অপ্রচলিত কিংবা বর্জিত, সেসব বানান নির্দেশ করা হয়েছে বর্জিত নির্দেশনাটি ব্যবহার করে।
বর্জিত শব্দের উদাহরণটি সাধারণ হরফে দেখানাে হয়েছে। যেমন : আবাদি বর্জিত আবাদী। বানানবিকল্প : যেসব শব্দের বানানভেদের ক্ষেত্রে অবিকল্প বানান নির্ধারণে মতৈক্য গড়ে ওঠেনি, সেসব বানান উপস্থাপন করা হয়েছে। বিকল্প নির্দেশনাটি ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প বানানযুক্ত শব্দটি মােটা হরফে দেখানাে হয়েছে। যেমন : ক্যানসার বিকল্প ক্যান্সার। বিকল্প বানান পরিহার : যেসব শব্দের বানান ব্যাকরণের নিয়মে শুদ্ধ হলেও প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, সেগুলাে নির্দেশনা পরিচিতি
নির্দেশ করা হয়েছে পরিহার্য নির্দেশনাটি ব্যবহার করে। বানানের সমতাবিধানের লক্ষ্যে এ ক্ষেত্রে ভুক্তি শব্দের বানানকেই অধিকতর গ্রহণযােগ্য বিবেচনা করা যেতে পারে।
পরিহার্য শব্দের উদাহরণটি সাধারণ হরফে দেখানাে হয়েছে। যেমন : খেত পরিহার্য ক্ষেত। সমােচ্চারিত শব্দের বানান-পার্থক্য : সমােচ্চারিত বা প্রায়-সমােচ্চারিত শব্দের বানান-পার্থক্য সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে তুলনীয় নির্দেশনাটি। এ ক্ষেত্রে সমােচ্চারিত বা প্রায়সমােচ্চারিত শব্দের উদাহরণটি মােটা হরফে দেখানাে হয়েছে। যেমন : কাশা (কাশি দেওয়া) তুলনীয়কাসা।। শব্দের অর্থ : অভিধানে কেবল সেই সমস্ত সমােচ্চারিত বা প্রায়সমােচ্চারিত শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে, যেগুলাের বানান-পার্থক্যের জন্য অর্থের পার্থক্য হয়ে থাকে । এ ধরনের শব্দের অর্থ উপস্থাপন করা হয়েছে প্রথম বন্ধনীর মধ্যে। যেমন : কত্রী (গৃহিণী) তুলনীয় কর্তৃ। ভুল বানান : যেসব বানান ব্যাকরণের নিয়মের সঙ্গে একেবারেই সংগতিপূর্ণ নয়, সেগুলােকে চিহ্নিত করা কয়েছে ভুল নির্দেশনাটি ব্যবহার করে। তা ভুল বানান পরিহারে সহায়ক হবে।
ভুল বানানের উদাহরণ সাধারণ হরফে দেখানাে হয়েছে। যেমন : অঙ্ক [ঙ-য় ক) ভুল অংক।
হাইফেনযুক্ত ভুক্তিশব্দ : যে সমস্ত শব্দ পরপদ হিসেবে সমাসবদ্ধ শব্দ গঠন করে, সেসব ভুক্তিশব্দের আগে হাইফেন ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন : কণ্ঠ ণে-এ ঠ] : উচ্চকণ্ঠ। নীলকণ্ঠ। মুক্তকণ্ঠ। বাঁকা হরফ, মােটা হরফ ও সরু হরফ : এ অভিধানে বাঁকা হরফ ব্যবহৃত হয়েছে নির্দেশনা-সংকেতগুলাের জন্য। অন্যদিকে ভুক্তিশব্দ, বিকল্প বানানের শব্দ, প্রমিত বানানের বিভিন্ন উদাহরণ দেখানাে হয়েছে মােটা হরফে। ভুল বানানের শব্দ, পরিহার্য শব্দ, বর্জিত শব্দ ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে সাধারণ হরফ।
Khotka banan obidhan pdf
বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকেই কোন না কোনাে শব্দের বানান নিয়ে দ্বিধায় ভােগেন, বিভ্রান্তির মুখােমুখি হন। এই দ্বিধা ও বিভ্রান্তি নিরসনে খটকা বানান অভিধান pdf সবার কাজে লাগবে।